একজন “খণ্ডকালীন” মায়ের দু’মুঠো আলাপ

যখন এই আবোলতাবোলের ঝাঁপি নিয়ে লিখতে বসেছি, তখন পশ্চিমের আকাশে গোধূলির সিঁদুর রঙের হাতছানি। টুনটুন তার পছন্দের লেগো ট্রেন নিয়ে ঘরময় দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে, তার প্রিয় “সাধের লাউ” গানটি বেজে চলেছে একটানা। তার নান নান (আমার মা), তার মামার (আমার বোন) সঙ্গে ভিডিও কলে ব্যস্ত, আর তার নানার (আমার বাবা) মাগরিবের নামাযের প্রস্তুতি চলছে। আমাদের অফিস-বারের চিত্র কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। আমার সূর্য অস্তাচলে পাড়ি জমায় মগবাজার উড়ালসেতুর ওপারে, যখন দিনের শেষ আলোর ছটা গাড়ির কাঁচ ভেদ করে আমার গালে এসে পড়ে। মা এসময়টা টুনটুনের খাবার তৈরি করায় ব্যস্ত থাকে। বাসায় পৌঁছে যখন দোরঘণ্টাটি ক্রিংক্রিং বাজাতে থাকি, টুনটুন তার ফোকলা হাসির ফুলঝুড়ি সমেত দরজায় এসে দাঁড়াবে। এরপর কিছুক্ষণ তার কসরত দেখিয়ে আবার পাড়ি জমাবে তার খেলার রাজ্যে।

ঘরে বসে অফিস – আমাদের পাতে যুক্ত হওয়া নতুন ব্যঞ্জন। কিন্তু ঘরে বসে অফিসের কাজ শুনতে যতোটা বিলাসিতা মনে হয়, বাস্তবে তা নয়। যখন জুম মিটিং এর মুঠোবার্তা মোবাইলের স্ক্রীনে উঁকি দিচ্ছে, তখন হয়তো বাচ্চার পছন্দের “বেবি শার্ক” বেজে চলেছে মুঠোফোনে। অফিসের দিনলিপি লেগোর টুকরোর নিচে চাপা পড়ে গিয়েছে কখন, মা হয়তো টেরও পাননি। ভিডিও কনফারেন্সের মাঝে কখনও বিশেষ অতিথিরও আগমন ঘটে মায়ের কোলে, যখন খেলনাবাটি নিয়ে খেলতে খেলতে মহাশয় হয়রান হয়ে পড়েন আর কান্না জুড়ে দেন। এই পরিস্থিতি এখন নিত্যদিনের, যা পুরোনো এক বিতর্ককে নতুন করে উসকে দেয় – কর্মজীবী মা বনাম গৃহিণী মা। 

মাঝেমাঝে ‘ওয়ার্কিং মাদার’ শব্দটাই ভাষার একটি ভুল প্রয়োগ বলে মনে হয়।

আমি যখন আমার স্নাতকোত্তর শিক্ষাজীবন শুরু করি,টুনটুনের বয়স তখন ৪০ দিন। ক্লাস শুরু করার পরপরই আমি নানান উপাধিতে ভূষিত হতে থাকি – “পাষাণ মা”, “অর্থলোভী মা”, “নারী সামন্তবাদী” – আরও কত কী! চাকরিতে যোগদানের পর আমার জীবনটা সার্কাসের রশির উপর চলতে থাকা কসরত প্রদর্শনকারীর মতো হয়ে গিয়েছিল, যে ভীড়ের মাঝে কর্মস্থল বনাম গৃহকোণের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। ভীড়ের মধ্যে থাকা সবাই যে উৎসাহ দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে তা নয়, কেউ কেউ সেখানে ভীড় করে করুণা দেখানোর জন্য আর সময়ে সময়ে “এতো খারাপ কেউ কীভাবে হতে পারে” বলে মাথা ঝাঁকানোর জন্য। যখন আমি চাকরিতে যোগদান করিনি, দাওয়াতে বা পার্টিতে পরিবার – পরিজনের লোক দেখানো সহানুভূতির  অভাব হতো না, কারণ আমি প্রকৌশল ডিগ্রীর প্রতি চূড়ান্ত অবহেলা করছি। আর যখন চাকরিতে যোগদান করলাম, তখন আমি অর্থের পিছনে ছুটতে থাকা একজন অযোগ্য মা হয়ে গেলাম। যেনো মায়েদের সম্মান দেখানোটাই সমাজের একটি গর্হিত কাজ।

মায়ের ভালোবাসা ঘড়ির কাঁটার হিসাবে পরিমাপ করা যায়না। একজন মা কীভাবে তার সন্তানের সাথে সময় কাটাচ্ছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

পরিস্থিতি যে গৃহিণী মায়েদের জন্যে খুব একটা সুখকর, তা নয়। টাকা কামাই করে না – এই খোঁটা তাকে হরহামেশা শুনতে হয়। কখনও রুটি বানাতে পারেনা বলে কথা শুনতে হয়, কখনও আবার পছন্দের শার্ট কেন ইস্ত্রী করা নেই – এই বলে স্বামীর চোখ রাঙানি দেখতে হয়। আমাদের সমাজে ধরেই নেওয়া হয় একজন গৃহিণী মা যেহেতু বাড়িতে থাকেন, সারাদিনে তার কাজ বলতে শুধু আচার মুখে নিয়ে জী বাংলার সিরিয়াল দেখা। বাকী সব কাজ দৈববলে হয়ে যায়।

সুপ্রাচীনকাল থেকে নারীর কাজ ও পুরুষের কাজের ফর্দ মানব ইতিহাসে খোদাই করা রয়েছে। মেয়েদের জন্মই হয়েছে ঘরকন্না করার জন্য আর পুরুষের জন্ম হয়েছে অর্থ উপার্জনের জন্য – নারীর পায়ে নিয়মের বেড়ি বাঁধা রয়েছে অনন্তকাল ধরে। আর যারা এই বেড়ি ভাঙার পণ করে, তাদের গায়ে পড়ে “বেয়াদব” অথবা “নারীবাদী” তকমা। সমাজের অধিকাংশ নারী এই প্রাচীন বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে, এদের মধ্যে কেউ কেউ অনেক চড়াই-ইতরাই পেরিয়ে আলোর দিশাও পেয়েছে। কিন্তু এখন সমাজ মায়েদের এক চিরন্তন মল্লযুদ্ধের মুখোমুখি করে দিয়েছে।

আমাদের সমাজে একজন নারীকে সর্বক্ষেত্রে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়- কেন এখনও বাচ্চা নিচ্ছে না কিংবা কেন এতো তাড়াতাড়ি বাচ্চা-কাচ্চা হয়ে গেলো, কেন এখনও চাকরি শুরু করছে না কিংবা চাকরি করার কী দরকার। যখনই সমাজে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, সেখানে সবসময়ই কথায় এবং কাজে একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। এখন অনেকেই বলছেন মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতি বাড়ানোর কথা, কিন্তু এরাই আবার ঠিক সময়ে পাতে ভাত না পড়লে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিবে। একারণেই হয়তো একজন মাকেই কেবল সন্তানের প্রয়োজনে ছুটির আবেদন করতে গেলেও মাথা নুইয়ে রাখতে হয়, অফিস মিটিং এ ভালো মা না হয়ে উঠতে পারার জন্য করুণার পাত্র হতে হয়।

মাতৃত্বের যতো শ্রেণিবিন্যাসই করা হোক না কেন, মায়েদের একটি বিশেষত্ব সর্বত্র প্রকাশ পাবে  – কর্মজীবী হোক বা গৃহিণী, মায়ের ভালোবাসা কখনও খণ্ডকালীন হয়না।

মাঝে মাঝে “ওয়ার্কিং মাদার” শব্দটাই ভাষার একটি ভুল প্রয়োগ বলে মনে হয় যা গৃহিণী মায়েদেরকে আরো কোণঠাসা করে ফেলে। একজন গৃহিণী মায়ের সারাদিনের কাজের তালিকা যেন ম্লান হয়ে যায় এই একটি শব্দের আড়ালে। বাস্তবতা হলো, একজন মা ঘরে কাজ করুক আর বাইরে, মায়েদের কাজের কোন বিরতি নেই।

একজন নিখুঁত মা হয়ে ওঠার চেয়ে সুখী মা হওয়াটা অধিক প্রয়োজন।

অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হওয়া প্রয়োজন, তবে কেউ যদি পরিস্থিতির কারণে সাবলম্বী হতে সময় নেয়, কিংবা নিপাট ঘরকন্না করতেই আনন্দ পায়, তাকে অপমান করার কোন অধিকার কারোর নেই। একজন নিখুঁত মা হয়ে ওঠার চেয়ে সুখী মা হওয়াটা অধিক প্রয়োজন। কে কর্মজীবী মা, কে গৃহিণী মা – এই বিচারে না গিয়ে বরং ভালো মায়ের সম্মাননা তাকেই দেওয়া উচিত যে মা তার সন্তানকে প্রকৃত মূল্যবোধ শিক্ষা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করছে। এখানে ঘড়ির কাঁটার হিসেব বিবেচ্য হতে পারে না, আর কোন শ্রেণিবিন্যাস এখানে মূখ্য নয়।

ভালোবাসা নিও,