সঙ্গনিরোধের নির্ঘণ্ট : আপনার সোনামণির দিনগুলোকে কীভাবে আনন্দময় করে তুলবেন

টুনটুন আঁকিবুকি করতে ভীষণ ভালোবাসে। দিনশেষে আবোলতাবোল ভাবনাগুলো ডায়েরিতে টুকে রাখার জন্য যখন সোফায় গা এলিয়ে বসি, টুনটুনও তখন ওর হিজিবিজি খাতা-পেন্সিল নিয়ে ডুবে থাকে ওর কল্পনার রাজ্যে। কিন্তু সেদিন ও যা আঁকল, তাতে আমি স্তম্ভিত।

সেটি ছিল ক*নাভাইরাসের একটি চিত্ররূপ।

সঙ্গনিরোধ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নিয়ে এসেছে এক আকস্মিক ছন্দপতন। বাড়িতে বসে অফিসের কাজ আমাদেরকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। আমাদের অশান্ত মন এক টুকরো শান্তির আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে হেঁসেলে, ঝুলবারান্দার এক চিলতে সবুজের মাঝে বা অন্য কোথাও। কিন্তু বাড়ির সবথেকে ছোট সদস্যের জন্য যে কাজটা খুব একটা সহজ নয়। শিশুদের একইসাথে ব্যস্ত এবং হাসিখুশি রাখা যেমন কষ্টসাধ্য, টিভির পর্দা থেকে উৎসুক চোখজোড়া সরিয়ে রাখতেও বাবা-মায়েদের যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়। মহামারীর এই সময়টিতে অফিস এবং ঘরকন্না সামলাতে সকলেরই প্রাণ ওষ্ঠাগত, যার মাঝে নিজের জন্য সময় বের করাই কঠিন।

“আমার বাচ্চা এক জায়গায় ১০ মিনিটের বেশি বসতেই চায় না। কত খেলনা দিবো? কোনও খেলনা দিয়েই বসিয়ে রাখা যায়না।”

– অধিকাংশ মায়ের অনুযোগ।

উপরন্তু, স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাদের সময় কাটানোর জন্য ফ্রী ওয়ার্কশীট, বিজ্ঞানবাক্স, স্ক্যাভেঞ্জার হান্ট কিংবা অনলাইন কোর্স – অনেককিছুই ইন্টারনেটে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু, ছোট শিশুদের জন্য সুযোগ একদমই সীমিত। ইন্টারনেট চষে বেড়ালে প্রচুর খেলনা হয়তো পাওয়া যাবে ঠিকই কিন্তু বাড়িকে খেলনার দোকান বানিয়ে ফেলা যায় না। একজন মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল কাল। তিনি বলছিলেন – “আমার বাচ্চা এক জায়গায় ১০ মিনিটের বেশি বসতেই চায় না। কত খেলনা দিবো? কোনও খেলনা দিয়েই বসিয়ে রাখা যায়না।” একই অনুযোগ অধিকাংশ মায়েদের।

A Bangladeshi mom blogger named the aboltabol maa with her son at a planetarium for a quality time. the abotabol maa is wearing a yellow kurti and the baby is wearing a shirt with a short pant. he has spider man shoes. the aboltabol maa is a mom blogger from Dhaka Bangladesh. She is also called the royal bengal mom.
খেলার মাঠ ছেড়ে এখন ছোট্ট শিশুরা চারদেয়ালে বন্দি। তাই শিশুদের মনে লকডাউনের প্রভাবও পড়ছে সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই লকডাউন তুলে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু মহামারীর শঙ্কা এখনও কাটেনি। এই মহামারীর প্রভাব শুধুমাত্র শারীরিক নয়, মানসিকও। শিশুদের মনে এর প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে বেশি। খেলার মাঠ ছেড়ে এখন ছোট্ট শিশুরা চারদেয়ালে বন্দি। এই বন্দিজীবনে খানিকটা খুশির আলো ছড়াতে আজকের এই আবোলতাবোল আলাপ। শৈশবের রঙ্গে রঙিন মা-পিডিয়ার আজকের আয়োজন।

টুনটুনের সঙ্গ-নিরোধের দিনগুলো কীভাবে সাতরঙা হয়ে উঠলো –

আজকের আলোচনা শুরুর আগে দু’টি কথা –

প্রথমত: দিনের কোন সময় কোন ধরণের খেলাগুলো বাচ্চাদেরকে দেওয়া যায়, তার একটা পরিকল্পনা আগে-ভাগে সেরে নেওয়া ভালো। সবকিছু একসাথে পেয়ে বসলে শিশুরা খেলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

দ্বিতীয়ত: দিনের কিছু সময়ের জন্য খেলার কিছু না পেলে চিন্তার কিছু নেই। আর কিছু সময় টিভির সামনে বসে পড়লেও মন খারাপ করার কিছু নেই। সময়টা আমাদের সবার জন্যই কঠিন। এর মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। 

some acrylic colors, sme pencil colors, some crayons with a laptop bag from Suchi Shoili on facebook. there is also a hand sanitizer. these are bought by the aboltabol maa, or the royal bengal mom who is a bangladeshi mom blogger from dhaka bangladesh. she is a prominent writer in bangladesh
রঙিন যেকোন জিনিস বাচ্চারা খুবই পছন্দ করে। আঁকিবুকির শুরুর দিকে মোমরঙ বেছে নেওয়া যায়।

রাঙিয়ে দিয়ে যাও বাচ্চাদের জগতটাই রঙিন। রঙিন যেকোন জিনিস বাচ্চারা খুবই পছন্দ করে। লকডাউনের প্রথম দিনই আমি টুনটুনের জন্য রঙ করার বেশ কিছু সামগ্রী কিনে আনি। টুনটুনের জন্য Crayola বা যেকোন শিশুবান্ধব মোমরঙই (crayon) আমার পছন্দ। বাচ্চাদের হাতে পেন্সিল রঙ না দেওয়াই ভালো। পেন্সিলের সরু ডগা দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। আমরা যেকোন হিজিবিজি আঁকিবুকি দিয়ে আমাদের রঙের খেলা শুরু করি। কখনও টুনটুনকে কিছু ছবি দেখিয়ে বেছে নিতে বলি  এবং সেটা আঁকার চেষ্টা করি। বিন্দু বিন্দু দিয়ে কোন আকৃতি এঁকে তাতে বিন্দুগুলো মিলাতেও বলা যায়। টুনটুনকে এভাবে মিলাতে বললে সে মহাব্যস্ত হয়ে পড়ে।  

বলো তো এটা কী প্রাণীজগতের বন্ধুদের টুনটুনের ভারি পছন্দ। ন্যাট জিও ওয়াইল্ডে “আয়ান” কোয়ালাকে “মাম্মাম” কোয়ালার সঙ্গে দেখে সে খুশিতে লাফিয়ে উঠে। সিংহ মামাকে দেখে চিনতে পারলে তার মুখের হাসির রেখাটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখনই আমার মাথায় ফ্ল্যাশ কার্ডের চিন্তাটি আসে। বই থেকেও বিভিন্ন ছবি দেখিয়ে ছবির প্রাণীটির নাম শেখানোর চেষ্টা করা যায়। কিংবা পুরোনো পত্রিকা বা বাজারের মোড়ক থেকে জীবজন্তু, ফুল, ফল – এসবের ছবি কেটেও ফ্ল্যাশ কার্ড বানানো যায়। 

বাংলা এবং ইংরেজী বর্ণমালার ফ্ল্যাশকার্ড কোথায় পাবো

চলো কিছু বানাই – শিশুরা তাদের কল্পনার রাজ্যকে বাস্তবরূপ দিতে বরাবরই পছন্দ করে। বাচ্চাদের হাতে  শিশুবান্ধব ক্লে দিলে তারা অনায়াসেই “রামগরুড়ের ছানা” বানিয়ে ফেলতে পারে। ক্লে পাওয়া যাচ্ছে না? কোন সমস্যা নেই, ময়দা আছে তো! ময়দার সঙ্গে একটু বেকিং পাউডার আর তেল মিশিয়ে পরোটার মতোন মাখিয়ে তাতে পছন্দের ফুড কালার দিয়ে খুব সহজেই ক্লে বানিয়ে ফেলা যায়। ফুড কালার না পেলে শিশুবান্ধব এক্রিলিক রঙও দেওয়া যায়। তবে আপনার শিশুটির যদি সবকিছু সহজে মুখে দেওয়ার অভ্যাস থাকে, তাহলে এক্রিলিক রঙ ব্যবহার না করাই ভালো।  

A toddler from Dhaka Bangladesh named Tuntun is cutting papers with  a plastic scissors which we got from Boi bichitra gallery in gulshan. He is the son of the aboltabol maa, aka the royal bengal mom who is a bangladesh based mmom blogger in dhaka. she is a prominent writer and one of the first mom bloggers in bangladesh.
বাচ্চাদের হাতে ধারাল ধাতব কাঁচি কখনই দেওয়া উচিত নয়। অবশ্যই এ ধরণের কাজগুলো অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে করতে হবে।

“আপনার বাচ্চার কাছে আপনিই সুপারমম, যার সুপারপাওয়ার হলো – ভালোবাসা। শুধু এই ভালোবাসাটুকুই ওদের প্রয়োজন, তাতেই চলবে।” 

এবার করি কাটাকুটি – প্রতিদিন আমরা নানা ধরণের মোড়ক আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দিই। কিন্তু এই মোড়কগুলোই বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন আকৃতিতে কেটে দেখানো যায়। টুনটুনের জন্য আমি বই বিচিত্রা গ্যালারিতে একটি প্লাস্টিকের কাঁচি পেয়েছিলাম। যদি শিশুবান্ধব কোন কাঁচি না পাওয়া যায়, তাহলে বাচ্চাদের হাতে কাঁচি দিবেন না। আপনি এভাবে কাঁচি দিয়ে বিভিন্ন আকৃতিতী কাগজ কেটে বিভিন্ন বস্তুর আকার এবং রঙ শেখাতে পারেন।

মিলাতে কি পারো ? – পাজলের টুকরো একটার পর একটা জুড়ে দিয়ে যখন হাতি-ঘোড়া ভেসে ওঠে, বাচ্চাদের খুশি তখন দেখে কে? বিভিন্ন স্টেশনারি দোকানে ৪/৮ পিসের ছোট পাজল কিনতে পাওয়া যায়। কিংবা খেলনার মোড়ক বা পত্রিকার কোন ছবিকে ৪ টুকরো করে কেটে সেগুলোও পাজল হিসাবে ব্যবহার করা যায়। বাচ্চারা মিলাতে পারুক বা না পারুক, এই টুকরোগুলো ওদের মুখে অখণ্ড হাসি এনে দিবে। 

বাচ্চাদের পাজল কোথায় পাবো

A lego Duplo set with a giraffe and a baby of color with yellow dress and blue pants. he has red balloons in his hands. the giraffe is an original lego animal set bought from toronto lego shop in canada. this is the lego set of Tuntun, son of The Aboltabol Maa, aka the royal bengal mom. She is a prominent writer in bangladesh who is one of the first mom bloggers in Bangladesh. She is a bangladeshi mom blogger from Dhaka
বাচ্চাদের এই বিল্ডিং ব্লক সেটগুলো একটি অন্যতম শিক্ষামূলক খেলা্র সামগ্রী হতে পারে।

আমরাও গড়তে পারি – টুনটুনের অন্যতম পছন্দের খেলনা হলো লেগো সেট। কিম্ভূতকিমাকার সব জিনিস সে বানায় লেগো দিয়ে। কিন্তু তাতে কোন সমস্যা নেই, মনের মাধুরি মিশিয়ে এসব বানাতে সে খুবই পছন্দ করে আর সেটাই বড় কথা। বিল্ডিং ব্লক না থাকলেও ক্ষতি নেই। বাড়িতে ছোট খেলনা, ছোট বাটি এসব একটার উপর একটা সাজিয়েও বাচ্চারা দারুণ দূর্গ বানিয়ে ফেলতে পারে। লেগো ব্লক দিয়ে আমরা বিভিন্ন আকৃতিও আঁকার চেষ্টা করি। কাজেই, এক ধরণের খেলনা শুধু একটি খেলাতেই ব্যবহার করা যাবে তা নয়। 

রান্নাবাটি – শিশুরা বরাবরই অনুকরণপ্রিয়। বাচ্চারা যখন বড়দের রান্না করতে দেখে, তারাও কোথা থেকে বাটি চামচ নিয়ে হাজির হয় রান্না করবে বলে। রান্নার উপকরণ হিসেবে খেলনা সবজি বা রান্নাঘর থেকেও পরিষ্কার সবজি কেটে দেওয়া যায়।

গুপি গাইন ও বাঘা বাইনের যুগলবন্দি – টুনটুন ড্রাম বাজাতে ভীষণ পছন্দ করে। হাতের কাছে যা পাবে, তাই দিয়েই টুনটুন ড্রাম বাজাতে থাকবে। ড্রাম সেটের প্রয়োজন নেই, প্লাস্টিকের বাটি চামচ দিয়েও ওরা দিব্যি বাজিয়ে নিবে। তবে একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, ড্রামের শব্দে কানে তালা লাগতেই পারে। কাজেই এমন কিছু দেওয়া ভালো যাতে অপেক্ষাকৃত কম শব্দ হবে। 

হ-য-ব-র-ল – যখন কিছুতেই কিছু মাথায় আসে না, পরিষ্কার চাদর নিয়ে তাতে মুড়ি ছিটিয়ে দিই। মুড়ি কুড়াতে কুড়াতে অনেকটা সময় তারা নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দিতে পারবে। 

এবার নটে গাছটি মুড়োবে। প্রতিটি বাচ্চাই আলাদা। এই পদ্ধতিগুলো আমি টুনটুনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছি এবং কাজেও দিয়েছে। তার মানে এই নয় যে অন্য কোন শিশুরও তা পছন্দ হতে হবে। তাই প্রথমে এটা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি যে বাচ্চাটি কী ধরণের কাজে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করছে। আর একটি কথা, আমরা কেউই পেশাদার গাইয়ে বা আঁকিয়ে নই। কাজেই আঁকাটা কেমন হয়ে গেলো, কিংবা গানটা কেমন বেসুরো গেয়ে ফেললাম – এই ভেবে হীনম্মন্যতায় একদমই ভুগবেন না। আপনার যদি মনে হয় কাজটি করলে আপনার সন্তান আনন্দ পাবে তো করে ফেলুন। আপনার বাচ্চার কাছে আপনিই সুপারমম, যার সুপারপাওয়ার হলো – ভালোবাসা। শুধু এই ভালোবাসাটুকুই ওদের প্রয়োজন, তাতেই চলবে।

ভালোবাসা নিও,