বন্দিদশার অবসান: আনন্দের না বিভীষিকার

সঙ্গনিরোধের শুরুর দিন থেকেই আমি শব্দ বুনে চলেছি সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো সেই একটি প্রশ্নের জবাব দিবো বলে – “লকডাউন শেষ হলে প্রথম দিনটি আমি কীভাবে কাটাতে চাই”। দিনপঞ্জির পাতা উলটে অবশেষে সেই দিনের দেখা মিললো। কিন্তু সঙ্গনিরোধের পর্দা সরিয়ে প্রথম যখন চোখ মেলে তাকালাম, সবটাই কেমন অন্যরকম মনে হলো। “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” বোধকরি একেই বলে। লকডাউনের পর প্রথম যে সূর্যোদয় দেখার জন্য এতোদিন অপেক্ষা করেছি, দিনের প্রথম আলো চাতক পাখির সেই তেষ্টা মেটাতে পারলো না।

তেমন কিছুই বদলায়নি এই ক’ দিনে, তবুও কিছুই যেন আর আগের মতোন নেই।

যে কুকুরছানাগুলোকে শেষ কর্মদিবসে দেখে গিয়েছিলাম অফিস আঙিনায় হুটোপুটি খাচ্ছে, তারা আজ পুরো তাদের মায়ের মতোন দেখতে।

অফিসের কাজ পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছে আজ দু’সপ্তাহ হলো। সকালবেলার তাড়াহুড়ো থেকে চার চাকার কোলাহল – সব দেখে মনে হচ্ছিল সকালের এলার্ম বন্ধ করে ঘুমানোর দিন বুঝি শেষ হলো। কালো পিচঢালা পথের নুড়িপাথরগুলো আগের মতোই এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে, কর্তাদের হাতের ছোঁয়া না পেয়ে আলমারির ভেতর ছুটিতে থাকা ফাইলগুলোতে ধুলো জমে গিয়েছে। যে কুকুরছানাগুলোকে শেষ কর্মদিবসে দেখে গিয়েছিলাম অফিস আঙিনায় হুটোপুটি খাচ্ছে, তারা আজ পুরো তাদের মায়ের মতোন দেখতে। একসাথে  সবাইকে দেখলে বোঝার জো নেই কে ছানা, কে মা। তেমন কিছুই বদলায়নি এই ক’ দিনে, তবুও কিছুই যেন আর আগের মতোন নেই।

এই লাল কাঁটাধারী দানবটি সর্বত্র থাবা বসাতে শুরু করা মাত্র বিশ্বের সকল দেশ সঙ্গনিরোধকেই প্রতিকার হিসেবে বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। সংক্রমণের হার এখনও তুঙ্গে, তবুও আমরা আমাদের গুহামানবীয় কড়চার ইতি এখানেই টানবো বলে ঠিক করেছি এবং গল্পের পরের অধ্যায় লেখা আরম্ভ করেছি যার নাম – “বন্দিদশার অবসান”। তিনমাসের অধিক সময় কবুতরের খোপে বন্দি থাকার পর প্রথম যখন অফিসে যোগদান করার ইমেইলটি পেলাম, বুকটা কেমন যেন ধক করে কেঁপে উঠেছিল। আমার তো খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু আমি ছিলাম ভীত-সন্ত্রস্ত। হয়তো শুধুমাত্র সংক্রমিত হয়ে পড়ার ভয়টাই একমাত্র কারণ ছিল না। নিজেকে একটা নিরাপদ আবরণে বন্দি করে ফেলার পর তা থেকে বেড়িয়ে আসাটা কোনওভাবেই সুখকর মনে হয়নি।

ট্রাকগুলোতে বাড়ির আসবাবপত্র তো ছিলোই, সাথে ছিলো কারো তিলতিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নের সংসারের ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো।

যখন প্রথমবারের মতো বাড়ির বাইরে পা রাখলাম, ভয় তখনই গ্রাস করতে শুরু করলো। সুরক্ষামূলক আবরণ আমার সারা শরীর মুড়ে রেখেছিল। সেদিন বৃষ্টিস্নাত ছিল এই শহর। ঢাকার আকাশ দেখে মনে হচ্ছিল ক্যানভাসের জলরঙ বুঝি এখনও শুকোয়নি। রাস্তায় জমে যাওয়া পানি কেটে যখন আমার গাড়ি সামনে এগিয়ে চলছিল, আমি গাড়ির কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখছিলাম নীল র‍্যাডিসন নামধারী দালানের চূড়া কীভাবে কালো মেঘের চাদরে ঢেকে গিয়েছে। কিন্তু সেদিন ঢাকার কাব্যিক সৌন্দর্য ছাপিয়ে বাড়ির বাইরে আসার আতঙ্কটাই কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। “সবুজ ঢাকা”-র স্বপ্নগুলো নীল মুখোশের আড়ালে কখন যেন ধূসর হয়ে গিয়েছে।

Though the lockdown is over, people are walking for the workplace. photo taken by Ava the aboltabol maa, one of the first parenting blogger,bangladeshi mom blogger. she is a bangladesh-based blogger living in Dhaka.
আমরা মহামারীকে জয় করতে পারিনি, বরং নির্মম বাস্তবতার কাছে নতিস্বীকার করেছি

ঢাকাকে সেদিন কোনওভাবেই প্রাণের শহর বলে মনে হয়নি। বনানীর মোড়ে বাচ্চাগুলো ফুল নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেনি ফুল লাগবে কীনা, বাচ্চাকোলে কোনও মহিলা এসে গাড়ির কাঁচে উঁকি দিয়ে জানতে চায়নি বাচ্চার বই লাগবে কীনা। মহাখালী পয়েন্টে একজন মহিলাকে প্রায়ই দেখতাম বাচ্চাকোলে বই বিক্রি করতো। বাচ্চাটা এখন কতো বড় হয়েছে কে জানে? ও কি এখনও ব্যস্ত রাস্তায় ওর মা’র কোলে ঘুমিয়ে পড়ে? সেই মহিলাও আর চোখে পড়েনি, আমার প্রশ্নের উত্তরও আর পাইনি। রাস্তায় ভিক্ষুকের ভীড় চিল কিন্তু রোগের ভয়ে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে এখন আর কেউ পয়সা কড়ি দেয়না। রাস্তার ধারে বসে থাকা দোকানীরা কেউ আর মনোহরি গয়না বিক্রি করেনা এখন। তারা এখন মুখোশ আর দস্তানা বিকিয়ে বেড়ায় ঢাকার পথে পথে, কিন্তু বিড়ি-সিগারেটের বিক্রিতে কোনও ভাটা পড়েনি। দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে প্রাণের শহরের প্রাণটাও দূরে কোথাও চলে গিয়েছে, কিন্তু বাস কাউন্টারে তবুও মানুষের সারি চোখে পড়ে। বাসা বদলের কিছু ট্রাক আমাদের গাড়ি পেরিয়ে এগিয়ে গেলো দেখলাম। ট্রাকগুলোতে বাড়ির আসবাবপত্র তো ছিলোই, সাথে ছিলো কারো তিলতিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নের সংসারের ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো।

অফিসে গিয়ে সেদিন লিফটে না চড়ে সিঁড়ি ভেঙেই উঠেছিলাম। দেখলাম, অফিস করণিক এখন চা-বিস্কুটের জায়গায় তাপ মাপার যন্ত্র নিয়ে সকলকে অভ্যর্থনা জানায়। অফিসে পা রাখার আগে জীবাণুনাশকে পা ডুবিয়ে আসতে হয় সকলকে। করমর্দনের জায়গায়  সম্ভাষণ জানাবার উপায় একমাত্র চোখের কোণে ভাঁজ দেখানো অদৃশ্য হাসি। খাকি নথির কাগজের ভাঁজে ভাঁজে এখন ভয় লুকিয়ে থাকে। মিটিং এর নোটবুকের জায়গা এখন নিয়ে নিয়েছে মোবাইল নোট অ্যাপ।

the sunset of dhaka sky. The story is about the first day of lockdown, written by Ava the aboltabol maa, one of the first bangladeshi mom bloggers, a parenting blogger of Bangladesh, she is a Bangladeshi younng writer. she is a bangladesh based blogger, living in dhaka.
অফিসের কাপড়ে চা খাওয়ার দিনগুলো বোধহয় সত্যিই গেছে, কিছুই আর বাকী নেই।

কাজের ফাঁকে মোবাইলের কোণে ভীড় করা বার্তাগুলো দেখার ফুরসত কেবল মেলে এই মধ্যাহ্নবিরতির সময়ই। কিন্তু এখন খাবার সময় মুখোশ সরাতে গিয়ে সেই বিরতিটুকুও হয়ে পড়েছে আতঙ্কের। আমার টেবিলের কোণে কফির মগের বদলে এখন শোভা পায় স্যানিটাইজারের বোতল। বাড়ি ফেরার পর সোফায় গা এলিয়ে দেওয়া এখন রূপকথার মতো শোনায়। অফিসের কাপড়ে চা খাওয়ার দিনগুলো বোধহয় সত্যিই গেছে, কিছুই আর বাকী নেই।

লকডাউন শেষে কী করবো ভাবতে গেলে আগে সবসময়ই একটা উত্তরই মাথায় আসতো – বুক ভরে শ্বাস নিবো। কিন্তু মুখোশের ভেতর থেকে যখন দম নিতে গেলাম, মৃত্যুর বোঁটকা গন্ধ এসে নাকে আঘাত করলো। বাতাসে আজ মৃত্যুর গন্ধ। যখন আমি “বন্দিদশার অবসান” শিরোনামে আমার গল্প লিখছিলাম, উপলব্ধি করলাম, আমরা মহামারীকে জয় করতে পারিনি, বরং নির্মম বাস্তবতার কাছে নতিস্বীকার করেছি।

ভালোবাসা নিও

The signature of The Aboltabol Maa, Ava, the royal bengal mom who is one of the first bangladeshi mom blogger. She is a Bangladesh based parenting blogger staying in Dhaka.